নীচের বিষয়গুলো খেয়াল রেখে, একজন ক্রেতা ফ্ল্যাট বুকিং দিলে বা কিনলে, ঠকে যাবার সম্ভাবনা কম:-
প্রথম পদক্ষেপ :
যেদিন ফ্ল্যাট বুকিং দেবেন, সেদিন টোকেন মানি হিসেবে ৫০ হাজার বা ২০ হাজার টাকা নিয়ে যাবেন না।যদি মনস্থির করেই থাকেন যে অমুক প্রজেক্ট থেকে ফ্ল্যাট বুকিং দেবেন, তাহলে ব্রোশিয়রের শেষ পৃষ্ঠায় থাকা Terms & Condition দেখে নিন, কত % টাকা দিলে "নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি সম্পাদন" করবে।যার সাথে ফ্ল্যাটের ব্যাপারে সমস্ত আলাপ হয়েছে, তাকে জানিয়ে দিন যে, আপনি কবে অফিসে যাচ্ছেন।ডাউন পেমেন্টের সব টাকাই পে-অর্ডার (কী নামে করবেন, তা টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনে লেখা থাকে) করে নিয়ে যাবেন।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আরো জানিয়ে দিন, প্রজেক্টের সব লিগ্যাল পেপারস যেন এক সেট ফটোকপি করে প্রস্তুত রাখে।দ্বিতীয় পদক্ষেপ :
কোম্পানির সঙ্গে জমির মালিকের চুক্তিপত্র (অনেক ডেভেলপার এটি দিতে চায় না, কিন্তু আপনি যেভাবেই হোক তা আদায় করে নেবেন)।Power of Attorney এর ফটোকপি।জমির মূল মালিকের মূল দলিলের ফটোকপি।জমির মূল মালিকের সিটি জরিপ ও আর.এস অনুযায়ী নামজারি পর্চা, জমাভাগ, ডি.সি.আর (ডুপ্লিকেট কার্বন রশিদ) ও খাজনার রশিদ।বায়া দলিলের ফটোকপি (মূল মালিকের আগে জমির মালিক যারা ছিলেন, তাদের দলিল)।সকল পর্চার ফটোকপি (ঢাকা মহানগর পর্চা, আর.এস পর্চা, সি.এস পর্চা, এস.এ পর্চা)।আপ টু ডেট খাজনার রশিদ।সিটি কর্পোরেশন হোল্ডিং ট্যাক্সের ফটোকপি।রাজউকের প্ল্যান পাসের কপির ফটোকপি।- (যদি সম্ভব হয়, কিছু টাকা দিয়ে রাজউক কর্তৃক প্ল্যান পাসের নকশার ফটোকপি সংগ্রহ করুন। এটি একটি বড় নকশা, তাই ডেভেলপার সাধারণত ফটোকপি করিয়ে রাখে না। নীলক্ষেত বা দৈনিক বাংলার মোড়ের দোকানগুলো থেকে ফটোকপি করিয়ে আনতে পারেন, প্রয়োজনে)।
তৃতীয় পদক্ষেপ :
যদি২ নং-এ উল্লেখিত লিগ্যাল পেপারের কোনো একটি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে ফ্ল্যাট বুকিং না দেওয়াই ভালো।যে কাগজটি নেই, সেটি ডেভেলপার জোগাড় করে যেদিন আপনাকে দিতে পারবে, সেদিনই ফ্ল্যাট বুকিং দিন।চতুর্থ পদক্ষেপ :
যদি বুকিং মানি হিসেবে আপনি "ডাউন পেমেন্ট" করবেন বলে ঠিক করে রাখেন, তাহলে ডাউন পেমেন্টের আগেই ডেভেলপারের সঙ্গে যে "দ্বি-পক্ষীয় চুক্তি" হবে, তার একটি নমুনা কপি চাইতে হবে।অধিকাংশ ডেভেলপার চুক্তির কপিটি ইংরেজিতে করে থাকে।যদি ইংরেজিতে ততটা দক্ষ না হন, তাহলে ডেভেলপারকে বলুন, "বাংলা ফরম্যাটে চুক্তিনামা" দিতে।ইংরেজি চুক্তিনামার অনেক টার্মসে ডেভেলপার টেকনিক্যাল বা সূক্ষ্ম কিছু ফাঁক-ফোকর রাখতে পারে, যা ফ্ল্যাটক্রেতা বুঝতে পারেন না।পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হলে, সেই টার্মসের কারণে ফ্ল্যাটক্রেতা কোনো প্রতিকার করতে পারেন না।পঞ্চম পদক্ষেপ :
বাংলায় বা ইংরেজীতে, যে কোন ফরম্যাটের চুক্তিনামার নমূনা কপি আপনাকে দিক না কেন, আপনি নিম্নে উল্লেখিত শর্তগুলো চুক্তিনামায় উল্লেখ আছে কি না তা দেখে নিনঃ-চুক্তিনামায় আপনার এবং ডেভেলপারের কর্তাব্যক্তির (যার সঙ্গে জমির মালিকের চুক্তি ও আম-মোক্তার নামা হয়েছে) নাম, বাবা-মায়ের নাম, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, ভোটার আইডি কার্ডের নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করুন।রাজউক কর্তৃক প্ল্যান পাসের নম্বর এবং তারিখ উল্লেখ আছে কি না, তা দেখুন।চুক্তির তারিখটি সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কিনা, তা যাচাই করুন।ফ্ল্যাটের মূল্য (ফ্ল্যাট মূল্য + কার পার্কিং মূল্য, যদি কিনতে চান + ইউটিলিটি বা অন্যান্য মূল্য) সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না দেখুন।- সবগুলোর আলাদা দাম চুক্তিতে আলাদাভাবে লিখে সর্বমোট দাম উল্লেখ করতে বলুন।
কিস্তির টাকা কীভাবে দেবেন, তা আপনার সঙ্গে আলোচনা অনুযায়ী সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না দেখুন।ফ্ল্যাটটি কবে হস্তান্তর করা হবে, সেই তারিখটি সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কিনা যাচাই করুন।জমির মালিকের সঙ্গে ডেভেলপারের চুক্তিপত্র অনুযায়ী প্রজেক্টটি বসবাস উপযোগী করে কবে হস্তান্তর করা হবে এবং আপনাকে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের তারিখের মধ্যে মিল আছে কিনা, তা খেয়াল করুন।- যদি তারিখে মিল না থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর না করলে, সেই সময়ের পর থেকে আপনাকে ফ্ল্যাটভাড়া কত করে দেওয়া হবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ আছে কিনা দেখুন।- যদি উল্লেখ না থাকে, তবে আলোচনা করে তা চুক্তিতে সংযোজন করুন।
- তবে, এ ক্ষেত্রে খেয়াল রাখুন, চুক্তি অনুযায়ী সঠিক সময়ে কিস্তির টাকা পরিশোধ করার পরেই আপনি ফ্ল্যাটভাড়া পেতে পারেন।
চুক্তিতে "ফ্ল্যাট মালিক সমিতির" জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে কি না দেখুন।- সকলের চুক্তিপত্রে উক্ত টাকার পরিমাণ একই আছে কি না, তা জেনে নিন।
তফসিলে আপনার ফ্ল্যাট নম্বর, ফ্ল্যাটটি কত তলায় এবং কোন পার্শ্বে, তা সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কিনা দেখুন।ষষ্ঠ পদক্ষেপ :
ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তিনামায় "Feature & Amenities" অর্থাৎ ক্রয়কৃত ফ্ল্যাটে কী কী নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হবে, তা উল্লেখ থাকতে হবে।নির্মাণ সামগ্রীর বিবরণ বাংলায় উল্লেখ থাকলে তা আরও ভালো।চুক্তিনামায় উল্লেখিত নির্মাণ সামগ্রীর তালিকা ভালোভাবে পড়ুন।সব তথ্য যাচাই করে তবেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করুন।সপ্তম পদক্ষেপ :
চুক্তিনামার শেষে ডেভেলপারের ছাপানো ব্রোশিয়ারের উল্লেখ থাকা উচিত, যেটি দেখে আপনি ফ্ল্যাট বুকিং দিচ্ছেন।চুক্তিনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে, ব্রোশিয়ারটি "চুক্তিনামার একটি অংশ।"ডেভেলপার তার স্বার্থে ব্রোশিয়ার পরিবর্তন করতে পারে, তাই এই শর্তটি থাকলে আপনাকে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে না।ব্রোশিয়ারের মূল কপি বা ফটোকপি সংরক্ষণে রাখুন।অষ্টম পদক্ষেপ :
চুক্তিনামায় কিস্তির টাকা পরিশোধের সিডিউল স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।কিস্তির টাকা পরিশোধের সিডিউল অনুযায়ী নির্মাণ কাজ চলছে কিনা, তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।নিশ্চিত করুন যে আপনি চুক্তিনামা অনুযায়ী কিস্তির টাকা পরিশোধ করছেন এবং ডেভেলপার সেই অনুপাতে নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।যদি ডেভেলপার আপনার প্রজেক্টের টাকা অন্য প্রজেক্টে ব্যবহার করে, তবে নিশ্চিত করুন যে এটি আপনার বুকিংকৃত প্রজেক্টের নির্মাণ সিডিউলকে প্রভাবিত করছে না।নির্মাণ কাজ সিডিউল অনুযায়ী না হলে, বিষয়টি ডেভেলপারের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করুন।
No comments:
Post a Comment